জাল

ঘুরতে ঘুরতে কীভাবে আমি যে রামলাল ব্রাহ্মণের কাছে গিয়ে পড়েছিলাম, তা আমি এখনো বলতে পারি না। হাজারিবাগের জঙ্গলে ঘুরছিলাম জীবিকা অর্জনের চেষ্টায়। সামান্য অবস্থার গৃহস্থের ছেলে, ম্যাট্রিক পাস দিয়ে অর্থ উপার্জনের ব্যাপারে কত জায়গায় না গিয়েছি। কে যেন বলেছিল, হর্তুকী আমলকী বয়ড়া চালান দিলে অনেক লাভ হয়। তারই সন্ধানে ঘুরছি, রামগড় থেকে দামোদর নদ পার হয়ে—ক্রমোচ্চ মালভূমির অরণ্যসংকুল পথে পথে।

জল খাব। বেজায় তৃষ্ণা। সে পাহাড়ের আর বনের অপূর্ব শোভার মধ্যে, বনজকুসুম-সুবাস ভেসে আসতে পারে বাতাসে, কিন্তু জলের সঙ্গে খোঁজ নেই।

রাঁচির লাল মোটর-সার্ভিসের বাসগুলো মাঝে মাঝে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। এক জায়গায় একটা বড়ো বাড়ি দেখলাম রাস্তা থেকে কিছুদূরে বনের মধ্যে। বিস্মিত যে না-হয়েছিলাম এমন নয়। এই পাণ্ডব-বর্জিত দেশে অন্তত দু-লক্ষ টাকা খরচ করে বাড়ি করলে কে? তার আবার মস্ত-বড়ো তোরণ, সাঁচীস্তুপের তোরণের অনুকরণে। তার ওপরে হিন্দিতে লেখা—’ভরহেচ নগর’।

সে কী ব্যাপার?

নগর কোথায় এখানে? একখানা তো বড়ো বাড়ি ওই অদূরে শোভা পাচ্ছে।

যাক গে, আমার তৃষ্ণার জল এক ঘটি পেলেই মিটে গেল।

ভরহেচ নগরের বিশাল তোরণ অতিক্রম করে প্রশস্ত রাজপথে পদচারণা করতে করতে প্রাসাদের মর্মরখচিত প্রশস্ত অলিন্দে গিয়ে সোজা উঠে পড়ি। এত-বড়ো নগরীতে জনসমাগম তেমন যে খুব বিপুল তা নয়। এ পর্যন্ত পুড়িয়ে খেতে একটি প্রাণীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয়নি।

এখন দেখছি, ওই যে একটু বুড়োমতো মানুষ বৈঠকখানায় বসে আছে বটে…

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললাম, থোড়া জল পিনে মাংতা।

বৃদ্ধ লোকটি আমার দিকে চেয়ে দেখেই ব্যস্ত হয়ে উঠল—ও, আপ পানি পিয়েঙ্গে? এই ভগীরথ, ই-ধার আও—আপ আইয়ে বৈঠিয়ে—আপ বাঙালি? আসুন, আসুন—বসেন। আমার বড়বাজারে কারবার ছিল। বাংলা জানি, বসেন।

এইভাবে রামলাল ব্রাহ্মণের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়।

—এই ভগীরথ, ঘোড়া পানি তো আগে পিলাও বাবুজিকো। চা খান?

—আজ্ঞে হ্যাঁ!

—এই ভগীরথ, সাবিত্রীকো বোলো চা বানানেকে লিয়ে। ভালো হয়ে বসুন। আপনার নাম কী আছে?

—আমার নাম হিতেন্দ্রনাথ কুশারী—দেশ বসিরহাট, চব্বিশ পরগনা।

—কুশারী? ব্রাহ্মণ আছে তো? না কী আছে?

—ব্রাহ্মণ, রাঢ়ীশ্রেণি।

—ঠিক আছে, নোমোস্কার। আমিও ব্রাহ্মণ আছি, আমার নাম রামলাল ব্রাহ্মণ, দেশ ভরহেচ নগর, বিকানীর।

—ও, তাই বুঝি…

—ঠিক ধরিয়েছেন। বাঙালি জাত বড়ো বুদ্ধিমান আছে। কথা গিরনেসে মালুম করলেতা হ্যায়। এ জায়গাটা আচ্ছা লাগে। বন আছে চারদিকে। গোলমাল নেই। তুলসীজি বলিয়েছেন, দণ্ডক-বনের শোভা কীরকম আছে?—

শোভিত দণ্ডক বন কী রুচি বনী ডাঁতিন ডাঁতিন সুন্দর ঘনী কুছু বুঝলেন? দণ্ডক-কাননের বড়ো শোভা আছে। বৃচ্ছ, ফল-পাত্তিসে খুব সুন্দর। রামায়ণের কথা আছে। তা এই জায়গাটা তেমনি লাগে আমার। দেড়শো বিঘে লিয়েছি এখানে বহুৎ সুবিস্তাসে। তিশ টাকা বিঘা।

—বলেন কী!

—কেন না হোবে? বাঘ ভালু ছাড়া এখানে বাস করবে কে?

—কার জমি?

—শিরোহির এক মৌজাদারের। ধরতীনারান মুন্সি, পুরুলিয়ায় কারবার-ভি আছে। ওখানেই থাকে।

জল এল। আমি বাইরে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে জল পান করলাম। শরীর ঠাণ্ডা হল। শুধু জল নিয়ে আসার জন্যে শুনলাম রামলাল ব্রাহ্মণ চাকরকে তাড়না করছে খাঁটি ঠেঁট হিন্দিতে, যার মর্ম হল—তোমার মগজে কোনো বুদ্ধি নেই। চাবুতারায় ভদ্রলোক এল, তুমি শুধু এক লোটা পানি…কেন, এক মুঠো শুখা বুটও কী ছিল না ঘরে? এই রকম আদব শিক্ষা হচ্ছে তোমার দিন দিন? মাইজিকে কিংবা রংধারীমাইকে জিগ্যেস করলে না কেন?

আমি জল খেয়ে ঘরে ঢুকতেই বৃদ্ধ কথা বন্ধ করে দিলে চাকরের সঙ্গে। আমার দিকে চেয়ে বললে—আউর পিয়েঙ্গে? নেহি? ঠিক আছে।…পান?

—পান চলে, তবে থাক সে এখন।

—আচ্ছা, থোড়া মিঠাই তো খা-লিজিয়ে! ও সাবিত্রী—

সাবিত্রী কোনো বড় মেয়ের নাম নয়। আট-নয় বছরের

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice